Tuesday, June 28, 2016

ইগো ফেলে দিন, সুখি থাকবেন

আজকাল বেশিরভাগ সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে ইগোর কারনে।
খুব সহজেই নিজের ভুল মেনে নেওয়ার মানসিকতা খুব কম মানুষেরই থাকে।
অধিকাংশ সময় আমরা নিজেদের কষ্টটাকেই বড় করে দেখি, আমাদের কথায় বা ব্যাবহারে যে অন্য কেউ কষ্ট পেতে পারে সেই কথাই ভুলে যাই।
আমরা কখনই আগে সরি বলিনা, ওপাশের মানুষটি কখন সরি বলবে এই আশায় থাকি।
আমরা খেয়াল করি না যে সেও আমার মতোই মানুষ, সেও সরি না বলে অপেক্ষায় আছে।
এই দ্বন্দ্বের কারণেই দূরত্ব সৃষ্টি হয়। 
যে মানুষ একসময় হৃদয়ের অনেক কাছে ছিল সে অনেক দূরে সরে যায়।
এই ইট-পাথরের জগত অনেক বেশি স্বার্থপর, আপনজন খুব কম মেলে এখানে। 
নিজেদের ছোট ছোট কিছু ভুল, নিজেদের ইগোর কারণে সেই মানুষগুলোকেও আমরা দূরে সরিয়ে দিই। একা হয়ে যাই আমরা।
শুধু একটু প্রচেষ্টা, অন্যের দিকটা একটু বুঝতে পারার মানসিকতাই কাছের মানুষগুলোকে হারিয়ে যেতে দেবে না
কখনও।

Tuesday, June 21, 2016

আবার ছোট হতে চাই

যখন আমরা ছোট ছিলাম...
  •  হাতগুলো জামার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে বলতাম, আমার হাত নেই।
  • একটা পেন ছিল, যার চার রকম কালি, আর আমরা তার চারটে বোতাম একসাথে টেপার চেস্টা করতাম।
  • দরজার পিছনে লুকিয়ে থাকতাম কেউ এলে চমকে দেব বলে, সে আসতে দেরি করছে বলে অধৈর্য হয়ে বেরিয়ে আসতাম।
  • ভাবতাম আমি যেখানে যাচ্ছি, চাঁদটাও আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে।
  • ইলেকট্রিক সুইচের দুদিকে আঙুল চেপে অন্-অফ এর মাঝামাঝি ব্যালেন্স করার চেষ্টা করতাম।
  • দু -ফোটা জল ফেলে রেস করাতাম, কোনটা গড়িয়ে আগে নীচে পড়ে।
  • বৃষ্টি হলে ছাতা না নিয়ে কচু বা কলাপাতা মাথায় দিয়ে বলতাম, দ্যাখ জল গায়ে লাগছে না।
  • তখন আমাদের শুধু একটা জিনিসের খেয়াল রাখার দায়িত্ব ছিল, সেটা হল স্কুলব্যাগ।
  • ফলের বিজ খেয়ে ফেললে দুশ্চিন্তা করতাম, পেটের মধ্যে এবার গাছ হবে!
  • ঘরের মধ্যে ছুটে যেতাম,তারপর কি দরকার ভুলে যেতাম, ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর মনে পড়ত।
এছাড়া আরও কত কি করতাম, মনে আছে তো তোমাদের?
যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন ধৈর্য্য সহ্য হতনা যে কবে বড় হব, বড় হলে কত কিছু করতে পারতাম সেটা ভেবে কত কিছু কল্পনা করতাম!
আর এখন মনে করি, কেন যে বড় হলাম!
আমাদের এই ছোট্ট জীবনে শৈশব হল সবথেকে সবথেকে ভালো, মজার এবং গুরুত্বপূর্ণ।
আমি জানি তুমি এগুলো পড়ছো আর তোমার মুখেও হাসি ফুটে উঠেছে, ছটবেলার কিছু মজার কথা মনে করছ আর সেগুলোকে মিস করছ।
ছোটবেলায় সবথেকে বেশিবার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নটার উত্তর আমি পেয়েছি অবশেষে - তুমি বড়ো হয়ে কি হতে চাও?
উত্তর-আবার ছোট হতে চাই৷ আবার শৈশবে ফিরে যেতে চাই।
আজ একটু অন্য ধরনের পোস্ট করলাম, আশা করি ভালো লেগেছে।

Thursday, June 16, 2016

প্রকৃত ভালবাসা

একটা ছেলে তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে রেষ্টুরেন্টে গেলো।

ছেলেটা বললোঃ আমার কাছে কিন্তু টাকা নেই, আজ তোমাকে বিল দিতে হবে।

মেয়ে: টাকা নেই আগে বলতে পারতে আমি আসতামনা।

ছেলেঃ এভাবে বলছো কেন?

মেয়েঃ আরে থামো তুমি আমায় কোনদিন খাইয়েছো ? আজ থেকে তোমার আমার সম্পর্ক এখানেই শেষ।

মেয়েটা বলেই চলে গেল, একবারও ফিরে তাকালোনা ছেলেটার দিকে।

ছেলেটা মন খারাপ করে হাঁটছিলো, এমন সময় একটা বাচ্চা পা জড়িয়ে ধরে বলল, "দাদা আমারে কিছু খেতে দেবেন?"

ছেলেটা পকেটে হাত দিয়ে দেখে ৩০ টাকা আছে, তাই দিয়েই বাচ্চাটাকে খাওয়ালো।

বাচ্চাটা খাচ্ছে আর কাঁদছে, সে কাঁদা সুখের কাঁদা।

খাওয়া শেষে বাচ্চাটা বললো, দাদা আপনাকে আমি কোনদিনও ভুলবোনা।

কথাটা শুনে ছেলেটারও কান্না পেয়ে গেল, ভাবল, আমি এতদিন আমার গার্লফ্রেন্ডের একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি।

আর এ মাত্র ৩০ টাকায় এত খুশি।

তারপর থেকে ছেলেটা রেলষ্টশনে গিয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের চকলেট, আইসক্রিম, চানাচুর এইগুলো কিনে দেয়।

তাদের সাথে খেলা করে, আর ছেলেটা যদি ১ দিন না যায় তারা সবাই মন খারাপ করে থাকে, তার কথা ভাবে, কাঁদে।

আর এটাই হলো প্রকৃত ভালবাসা।


Saturday, June 11, 2016

একটা মেয়ের গল্প

ফোনটা ভাইব্রেট করেই চলেছে।
স্ক্রিনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, হাত কাঁপছে।
এতদিন, এতবছর পর আবার সেই নাম্বার থেকে ফোন এসেছে বিশ্বাস হচ্ছে না।
আজও নাম্বারটা দেখে হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে যায়, মনের মাঝে প্রবল ঝড় বয়ে যায়, শেষপর্যন্ত রিসিভ করে ফেললাম।
ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত কন্ঠস্বর।
এতবছর পরও একটুও বদলায়নি। সেই আগের মতই আছে।
হ্যালো...
.
.
.
কি হল? কিছু বলছ না যে?
না! আসলে পাঁচ বছর পর এই নাম্বার থেকে ফোন আশা করিনি! তাই বুঝতে পারছিনা যে কি বলব!
কয়েকদিন থেকেই তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল, কিন্তু ফোন করার ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না।
কাল থেকে তোমার কন্ঠ শোনার খুব ইচ্ছে করছিল, তাই আজ সাহস করে ফোনটা করেই ফেললাম।
কেমন আছ তুমি ?
মানুষ বদলে যায় কিন্তু তাদের কন্ঠ বদলায় না।
হুম, আছি নিজের মত করে। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি।
জিঞ্জেস করবে না আমি কেমন আছি ?
উহু, প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা সবসময় ভাল থাকে, তুমি হচ্ছ তাদের একজন।
(ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা.......)
আমার কথা মনে পড়েনি তোমার?
হ্যা পড়েছে। অনেক মনে পড়েছে। যথন দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতাম তখন মনে পড়ত "তুমি ঠিকমত খাচ্ছ তো!" যখন রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে, কেঁদে কেঁদে অসুস্থ হয়ে পড়তাম তখন মনে পড়ত "তুমি সুস্থ আছ তো!" যখন কোন আনন্দোত্সবে সবাই হই-চই আর আনন্দে মেতে উঠত আর আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে অন্ধকারে বসে থাকতাম তখন মনে পড়ত "তুমি সবারসাথে খুশি আর আনন্দে মেতে উঠছ তো!" যখন আয়নায় নিজের অযত্ন অবহেলায় শুকিয়ে যাওয়া চেহারাটার দিকে তাকাতাম তখন মনে পড়ত "তুমি নিশ্চই আরো সুন্দর হয়ে গেছ!" একসময় অনেক মনে পড়েছে। এখন আর পড়ে না। এখন এত সময় কই এগুলো মনে পড়ার?
(ওপাশে আবার নিরবতা ......)
আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না?
ক্ষমা তো আমি তোমাকে পাঁচ বছর আগেই করে দিয়েছিলাম। তোমায় ক্ষমা না করলে আমার মনে তোমার দেয়া কষ্টগুলোর ক্ষত কোনভাবেই শুকাত না। আচ্ছা এখন তাহলে রাখি। এখন আমার আকাশ দেখার সময়। প্রতিদিন রাতে এইসময় আমি আকাশ দেখি। আকাশের সাথে কথা বলি। আকাশ কখনো আমার সাথে ছলনা করে না। প্রতি রাতে সে তারার ঝুলি নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়। আমি কথা বলি সে চুপচাপ শোনে।একটুও বিরক্ত হয়না।
একরাত আকাশের সাথে কথা না বললে হয় না? আমাদের কথা থেকে আকাশের কথা কি খুব বেশি জরুরী?
আপাতত তাই। আমার চরম অসহায়ত্ব আর একাকিত্বের সময় ঐ আকাশ আমায় সঙ্গ দিয়েছে। যে পাঁচ বছর আমায় দূরে সরিয়ে রেখেছিল তার জন্য আমি আমার পাঁচ বছরের পাশে থাকা সঙ্গীকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব না। আচ্ছা আমি এখন যাব। রাতের আকাশ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ খুব সুন্দর একটা চাঁদও উঠেছে আকাশে। আজ চাঁদের সাথেও কথা বলব.....
ফোনটা কেটে দিলাম।
বারান্দায় এসে দাড়ালাম।
আকাশের বুকে গোল একটা চাঁদ উঠেছে, তাকিয়ে আছি, খুব কষ্ট হচ্ছে।
সেই পাঁচবছর আগের মত কষ্ট যখন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে। কি দোষ ছিল আমার? কেন চলে গিয়েছিলে? আজ ও তা আমি জানিনা। তারপরও অটুট বিশ্বাস, আশা ধরে রেখেছিলাম একদিন তুমি আসবে। আমি অপেক্ষা করব। করেছি, অনেক অপেক্ষা করেছি। ভেবেছিলাম যেদিন তোমার ফোন আসবে খুশিতে চিত্কার দেব। তোমার কাছে ছুটে চলে যাব। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায় কিন্তু তুমি আসনি। কলেজ  পাশ করার পর দু-বছর হয়ে গেল। বাবা আমাকে অনেক ভালবাসে। সেই বাবাকে পর্যন্ত বলে দিলাম বিয়ে করব না।

বাবার দীর্ঘঃশ্বাস, দুঃখ ভরাক্রান্ত মন সবই উপেক্ষা করতাম। ঠিক পাঁচমাস আগে বাবা অনেক অসুস্থ হয়ে গেল। ডাক্তার বললেন মাইনর অ্যাটাক। এই বয়সে এত টেনশন ওনার সাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বাবার অসুস্থতার জন্য কোন না কোন ভাবে আমি দায়ী। কারণ বাবার সব টেনশন ছিল আমাকে নিয়ে। সারাদিন বাবার হাত ধরে বসে থাকতাম। বেশ কয়েকদিন পর বাবা একটু সুস্থ হয়ে উঠলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "মা আমার, ­ জীবনের মনে হয় আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। আমি সব সময় তোমাকে সুখী রাখতে চেয়েছি। মৃত্যুর আগেও আমি তোমাকে সুখী দেখে যেতে চাই। এটাই এখন আমার শেষ ইচ্ছা। একজন বাবা হিসেবে এর বেশি আর কিইবা চাওয়ার থাকতে পারে? মা, তুমি একবার ভেবে দেখ। ছেলেটা অনেক ভাল। তোমাকে অনেক সুখে রাখবে আমার বিশ্বাস। কোন তাড়াহুড়ো নেই।
ছেলেটার সাথে দেখা কর। তাকে বোঝার, চেনার চেষ্টা কর। তোমার পছন্দ না হলে কোন অসুবিধা নেই। শুধু তার সাথে দেখা করে, কথা বলে দেখ।
না, আর পারলাম না বাবার কথা অমান্য করতে। তার আকুতি ভরা দৃষ্টি উপেক্ষা করতে। বাবার পছন্দের ছেলেটার সাথে প্রথম দেখা করলাম দেড় মাস আগে। ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই। খুব সাধাসিধে ধরণের মানুষ। কথার মারপ্যাঁচ ধরতে পারেন না। লোকটার মা নেই।


মণিহারা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মণিহারা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে।
বোটের ছাদের উপরে মাঝি নমাজ পড়িতেছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত আকাশপটে তাহার নীরব উপাসনা ক্ষণে ক্ষণে ছবির মতো আঁকা পড়িতেছিল। স্থির রেখাহীন নদীর জলের উপর ভাষাতীত অসংখ্য বর্ণচ্ছটা দেখিতে দেখিতে ফিকা হইতে গাঢ় লেখায়, সোনার রঙ হইতে ইস্পাতের রঙে, এক আভা হইতে আর-এক আভায় মিলাইয়া আসিতেছিল।
জানালা-ভাঙা বারান্দা-ঝুলিয়া-পড়া জরাগ্রস্ত বৃহৎ অট্টালিকার সম্মুখে অশ্বত্থমূল-বিদারিত ঘাটের উপরে ঝিল্লিমুখর সন্ধ্যাবেলায় একলা বসিয়া আমার শুষ্ক চক্ষুর কোণ ভিজিবে-ভিজিবে করিতেছে, এমন সময়ে মাথা হইতে পা পর্যন্ত হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া শুনিলাম, “মহাশয়ের কোথা হইতে আগমন।”
দেখিলাম, ভদ্রলোকটি স্বল্পাহারশীর্ণ, ভাগ্যলক্ষ্মী কর্তৃক নিতান্ত অনাদৃত। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদেশী চাক্‌রের যেমন একরকম বহুকাল-জীর্ণসংস্কার-বিহীন চেহারা, ইঁহারও সেইরূপ। ধুতির উপরে একখানি মলিন তৈলাক্ত আসামী মটকার বোতাম খোলা চাপকান; কর্মক্ষেত্রে হইতে যেন অল্পক্ষণ হইল ফিরিতেছেন। এবং যেসময় কিঞ্চিৎ জলপান খাওয়া উচিত ছিল সে সময় হতভাগ্য নদীতীরে কেবল সন্ধ্যার হাওয়া খাইতে আসিয়াছেন।
আগন্তুক সোপানপার্শ্বে আসনগ্রহণ করিলেন। আমি কহিলাম, “আমি রাঁচি হইতে আসিতেছি।”
“কী করা হয়।”
“ব্যাবসা করিয়া থাকি।”
“কী ব্যাবসা।”
“হরীতকী, রেশমের গুটি এবং কাঠের ব্যবসা।”
“কী নাম।”
ঈষৎ থামিয়া একটা নাম বলিলাম। কিন্তু সে আমার নিজের নাম নহে।
ভদ্রলোকের কৌতুহলনিবৃত্তি হইল না। পুনরায় প্রশ্ন হইল, “এখানে কী করিতে আগমন।”
আমি কহিলাম, “বায়ুপরিবর্তন।”
লোকটি কিছু আশ্চর্য হইল। কহিল, “মহাশয়, আজ প্রায় ছয়বৎসর ধরিয়া এখানকার বায়ু এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যহ গড়ে পনেরো গ্রেন্‌ করিয়া কুইনাইন খাইতেছি কিন্তু কিছু তো ফল পাই নাই।”
আমি কহিলাম, “এ কথা মানিতেই হইবে রাঁচি হইতে এখানে বায়ুর যথেষ্ট পরিবর্তন দেখা যাইবে।”
তিনি কহিলেন, “আজ্ঞা, হাঁ, যথেষ্ট। এখানে কোথায় বাসা করিবেন।”
আমি ঘাটের উপরকার জীর্ণবাড়ি দেখাইয়া কহিলাম, “এই বাড়িতে।”
বোধকরি লোকটির মনে সন্দেহ হইল, আমি এই পোড়ো বাড়িতে কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পাইয়াছি। কিন্তু এ সম্বন্ধে আর কোনো তর্ক তুলিলেন না, কেবল আজ পনেরো বৎসর পূর্বে এই অভিশাপগ্রস্ত বাড়িতে যে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল তাহারই বিস্তারিত বর্ণনা করিলেন।
লোকটি এখানকার ইস্কুলমাস্টার। তাঁহার ক্ষুধা ও রোগ শীর্ণ মুখে মস্ত একটা টাকের নীচে একজোড়া বড়ো বড়ো চক্ষু আপন কোটরের ভিতর হইতে অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় জ্বলিতেছিল। তাঁহাকে দেখিয়া ইংরাজ কবি কোল্‌রিজের সৃষ্ট প্রাচীন নাবিকের কথা আমার মনে পড়িল।
মাঝি নমাজ পড়া সমাধা করিয়া রন্ধনকার্যে মন দিয়াছে। সন্ধ্যার শেষ আভাটুকু মিলাইয়া আসিয়া ঘাটের উপরকার জনশূন্য অন্ধকার বাড়ি আপন পূর্বাবস্থার প্রকাণ্ড প্রেতমূর্তির মতো নিস্তব্ধ দাঁড়াইয়া রহিল।
ইস্কুলমাস্টার কহিলেন—
আমি এই গ্রামে আসার প্রায় দশ বৎসর পূর্বে এই বাড়িতে ফণিভূষণ সাহা বাস করিতেন। তিনি তাঁহার অপুত্রক পিতৃব্য দুর্গামোহন সাহার বৃহৎ বিষয় এবং ব্যবসায়ের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন।
কিন্তু , তাঁহাকে একালে ধরিয়াছিল। তিনি লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন। তিনি জুতাসমেত সাহেবের আপিসে ঢুকিয়া সম্পূর্ণ খাঁটি ইংরাজি বলিতেন। তাহাতে আবার দাড়ি রাখিয়াছিলেন, সুতরাং সাহেব-সওদাগরের নিকট তাঁহার উন্নতির সম্ভাবনামাত্র ছিল না। তাঁহাকে দেখিবামাত্রই নব্যবঙ্গ বলিয়া ঠাহর হইত।
আবার ঘরের মধ্যেও এক উপসর্গ জুটিয়াছিল। তাঁহার স্ত্রীটি ছিলেন সুন্দরী। একে কালেজে-পড়া তাহাতে সুন্দরী স্ত্রী, সুতরাং সেকালের চালচলন আর রহিল না। এমন-কি, ব্যামো হইলে অ্যাসিস্ট্যান্ট্-সার্জনকে ডাকা হইত। অশন বসন ভূষণও এই পরিমাণে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল।
মহাশয় নিশ্চয়ই বিবাহিত, অতএব এ কথা আপনাকে বলাই বাহুল্য যে, সাধারণত স্ত্রীজাতি কাঁচা আম, ঝাল লঙ্কা এবং কড়া স্বামীই ভালোবাসে। যে দুর্ভাগ্য পুরুষ নিজের স্ত্রীর ভালোবাসা হইতে বঞ্চিত সে-যে কুশ্রী অথবা নির্ধন তাহা নহে, সে নিতান্ত নিরীহ।
যদি জিজ্ঞাসা করেন কেন এমন হইল, আমি এ সম্বন্ধে অনেক কথা ভাবিয়া রাখিয়াছি। যাহার যা প্রবৃত্তি এবং ক্ষমতা সেটার চর্চা না করিলে সে সুখী হয় না। শিঙে শান দিবার জন্য হরিণ শক্ত গাছের গুঁড়ি খোঁজে, কলাগাছে তাহার শিং ঘষিবার সুখ হয় না। নরনারীর ভেদ হইয়া অবধি স্ত্রীলোক দুরন্ত পুরুষকে নানা কৌশলে ভুলাইয়া বশ করিবার বিদ্যা চর্চা করিয়া আসিতেছে। যে স্বামী আপনি বশ হইয়া বসিয়া থাকে তাহার স্ত্রী-বেচারা একেবারেই বেকার, সে তাহার মাতামহীদের নিকট হইতে শতলক্ষ বৎসরের শান-দেওয়া যে উজ্জ্বল বরুণাস্ত্র, অগ্নিবাণ ও নাগপাশবন্ধনগুলি পাইয়াছিল তাহা সমস্ত নিস্ফল হইয়া যায়।
স্ত্রীলোক পুরুষকে ভুলাইয়া নিজের শক্তিতে ভালোবাসা আদায় করিয়া লইতে চায়, স্বামী যদি ভালোমানুষ হইয়া সে অবসরটুকু না দেয় তবে স্বামীর অদৃষ্ট মন্দ এবং স্ত্রীরও ততোধিক।
নবসভ্যতার শিক্ষামন্ত্রে পুরুষ আপন স্বভাবসিদ্ধ বিধাতাদত্ত সুমহৎ বর্বরতা হারাইয়া আধুনিক দাম্পত্যসম্বন্ধটাকে এমন শিথিল করিয়া ফেলিয়াছে। অভাগা ফণিভূষণ আধুনিক সভ্যতার কল হইতে অত্যন্ত ভালোমানুষটি হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছিল— ব্যবসায়েও সে সুবিধা করিতে পারিল না, দাম্পত্যেও তাহার তেমন সুযোগ ঘটে নাই।
ফণিভূষণের স্ত্রী মণিমালিকা বিনা চেষ্টায় আদর, বিনা অশ্রুবর্ষণে ঢাকাই শাড়ি এবং বিনা দুর্জয় মানে বাজুবন্ধ লাভ করিত। এইরূপে তাহার নারীপ্রকৃতি এবং সেইসঙ্গে তাহার ভালোবাসা নিশ্চেষ্ট হইয়া গিয়াছিল; সে কেবল গ্রহণ করিত, কিছু দিত না। তাহার নিরীহ এবং নির্বোধ স্বামীটি মনে করিত, দানই বুঝি প্রতিদান পাইবার উপায়। একেবারে উলটা বুঝিয়াছিল আর কি।
ইহার ফল হইল এই যে, স্বামীকে সে আপন ঢাকাই শাড়ি এবং বাজুবন্ধ জোগাইবার যন্ত্রস্বরূপ জ্ঞান করিত; যন্ত্রটিও এমন সুচারু যে, কোনোদিন তাহার চাকায় এক ফোঁটা তেল জোগাইবারও দরকার হয় নাই।
ফণিভূষণের জন্মস্থান ফুলবেড়ে, বাণিজ্যস্থান এখানে। কর্মানুরোধে এইখানেই তাহাকে অধিকাংশ সময় থাকিতে হইত। ফুলবেড়ের বাড়িতে তাহার মা ছিল না, তবু পিসি মাসি ও অন্য পাঁচজন ছিল। কিন্তু ফণিভূষণ পিসি মাসি ও অন্য পাঁচজনের উপকারার্থেই বিশেষ করিয়া সুন্দরী স্ত্রী ঘরে আনে নাই। সুতরাং স্ত্রীকে সে পাঁচজনের কাছ থেকে আনিয়া এই কুঠিতে একলা নিজের কাছেই রাখিল। কিন্তু অন্যান্য অধিকার হইতে স্ত্রী-অধিকারের প্রভেদ এই যে, স্ত্রীকে পাঁচজনের কাছ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া একলা নিজের কাছে রাখিলেই যে সব সময় বেশি করিয়া পাওয়া যায় তাহা নহে।
স্ত্রীটি বেশি কথাবার্তা কহিত না, পাড়াপ্রতিবেশিনীদের সঙ্গেও তাহার মেলামেশা বেশি ছিল না ব্রত উপলক্ষ্য করিয়া দুটো ব্রাক্ষ্মণকে খাওয়ানো বা বৈষ্ণবীকে দুটো পয়সা ভিক্ষা বেশী দেওয়া কখনো তাহার দ্বারা ঘটে নাই। তাহার হাতে কোনো জিনিস নষ্ট হয় নাই; কেবল স্বামীর আদরগুলা ছাড়া আর যাহা পাইয়াছে সমস্তই জমা করিয়া রাখিয়াছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সে নিজের অপরূপ যৌবনশ্রী হইতেও যেন লেশমাত্র অপব্যয় ঘটিতে দেয় নাই। লোকে বলে, তাহার চব্বিশ বৎসর বয়সের সময়ও তাহাকে চৌদ্দবৎসরের মতো কাঁচা দেখিতে ছিল। যাহাদের হৃৎপিণ্ড বরফের পিণ্ড, যাহাদের বুকের মধ্যে ভালোবাসার জ্বালাযন্ত্রণা স্থান পায় না, তাহারা বোধ করি সুদীর্ঘকাল তাজা থাকে, তাহারা কৃপণের মতো অন্তরে বাহিরে আপনাকে জমাইয়া রাখিতে পারে।
ঘনপল্লবিত অতিসতেজ লতার মতো বিধাতা মণিমালিকাকে নিষ্ফলা করিয়া রাখিলেন, তাহাকে সন্তান হইতে বঞ্চিত করিলেন। অর্থাৎ তাহাকে এমন একটা-কিছু দিলেন না যাহাকে সে আপন লোহার সিন্দুকের মণিমাণিক্য অপেক্ষা বেশি করিয়া বুঝিতে পারে, যাহা বসন্তপ্রভাতের নবসূর্যের মতো আপন কোমল উত্তাপে তাহার হৃদয়ের বরফপিণ্ডটা গলাইয়া সংসারের উপর একটা স্নেহনির্ঝর বহাইয়া দেয়।
কিন্তু মণিমালিকা কাজকর্মে মজবুত ছিল। কখনোই সে লোকজন বেশি রাখে নাই। যে কাজ তাহার দ্বারা সাধ্য সে কাজে কেহ বেতন লইয়া যাইবে ইহা সে সহিতে পারিত না। সে কাহারও জন্য চিন্তা করিত না, কাহাকেও ভালোবাসিত না, কেবল কাজ করিত এবং জমা করিত, এইজন্য তাহার রোগ শোক তাপ কিছুই ছিল না; অপরিমিত স্বাস্থ্য, অবিচলিত শান্তি এবং সঞ্চীয়মান সম্পদের মধ্যে সে সবলে বিরাজ করিত।
অধিকাংশ স্বামীর পক্ষে ইহাই যথেষ্ট; যথেষ্ট কেন, ইহা দুর্লভ। অঙ্গের মধ্যে কটিদেশ বলিয়া একটা ব্যাপার আছে তাহা কোমরে ব্যথা না হইলে মনে পড়ে না; গৃহের আশ্রয়স্বরূপে স্ত্রী যে একজন আছে ভালোবাসার তাড়নায় তাহা পদে পদে এবং তাহা চব্বিশঘণ্টা অনুভব করার নাম ঘরকর্‌‌‌নার কোমরে ব্যথা। নিরতিশয় পাতিব্রত্যটা স্ত্রীর পক্ষে গৌরবের বিষয় কিন্তু পতির পক্ষে আরামের নহে, আমার তো এইরূপ মত।
মহাশয়, স্ত্রীর ভালোবাসা ঠিক কতটা পাইলাম, ঠিক কতটুকু কম পড়িল, অতি সূক্ষ্ম নিক্তি ধরিয়া তাহা অহরহ তৌল করিতে বসা কি পুরুষমানুষের কর্ম! স্ত্রী আপনার কাজ করুক, আমি আপনার কাজ করি, ঘরের মোটা হিসাবটা তো এই। অব্যক্তের মধ্যে কতটা ব্যক্ত, ভাবের মধ্যে কতটুকু অভাব, সুস্পষ্টের মধ্যেও কী পরিমাণ ইঙ্গিত, অণুপরমাণুর মধ্যে কতটা বিপুলতা— ভালোবাসাবাসির তত সুসূক্ষ্ম বোধশক্তি বিধাতা পুরুষমানুষকে দেন নাই, দিবার প্রয়োজন হয় নাই। পুরুষমানুষের তিলপরিমাণ অনুরাগ-বিরাগের লক্ষণ লইয়া মেয়েরা বটে ওজন করিতে বসে। কথার মধ্য হইতে আসল ভঙ্গীটুকু এবং ভঙ্গীর মধ্য হইতে আসল কথাটুকু চিরিয়া চিরিয়া চুনিয়া চুনিয়া বাহির করিতে থাকে। কারণ, পুরুষের ভালোবাসাই তাহাদের বল, তাহাদের জীবনব্যবসায়ের মূলধন। ইহারই হাওয়ার গতিক লক্ষ্য করিয়া ঠিক সময় ঠিকমতো পাল ঘুরাইতে পারিলে তবেই তাহাদের তরণী তরিয়া যায়। এইজন্যই বিধাতা ভালোবাসামান- যন্ত্রটি মেয়েদের হৃদয়ের মধ্যে ঝুলাইয়া দিয়াছেন, পুরুষদের দেন নাই।
কিন্তু বিধাতা যাহা দেন নাই সম্প্রতি পুরুষরা সেটি সংগ্রহ করিয়া লইয়াছেন। কবিরা বিধাতার উপর টেক্কা দিয়া এই দুর্লভ
যন্ত্রটি, এই দিগ্‌দর্শন যন্ত্রণাশলাকাটি নির্বিচারে সর্বসাধারণের হস্তে দিয়াছেন। বিধাতার দোষ দিই না, তিনি মেয়েপুরুষকে যথেষ্ট ভিন্ন করিয়াই সৃষ্টি করিয়াছিলেন, কিন্তু সভ্যতায় সে ভেদ আর থাকে না, এখন মেয়েও পুরুষ হইতেছে, পুরুষও মেয়ে হইতেছে; সুতরাং ঘরের মধ্য হইতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিদায় লইল। এখন শুভবিবাহের পূর্বে পুরুষকে বিবাহ করিতেছি না মেয়েকে বিবাহ করিতেছি, তাহা কোনোমতে নিশ্চয় করিতে না পারিয়া, বরকন্যা উভয়েরই চিত্ত আশঙ্কায় দুরু দুরু করিতে থাকে।
আপনি বিরক্ত হইতেছেন! একলা পড়িয়া থাকি, স্ত্রীর নিকট হইতে নির্বাসিত; দূর হইতে সংসারের অনেক নিগূঢ় তত্ত্ব মনের মধ্যে উদয় হয়— এগুলো ছাত্রদের কাছে বলিবার বিষয় নয়, কথাপ্রসঙ্গে আপনাকে বলিয়া লইলাম, চিন্তা করিয়া দেখিবেন।
মোট কথাটা এই যে, যদিচ রন্ধনে নুন কম হইত না এবং পানে চুন বেশি হইত না, তথাপি ফণিভূষণের হৃদয় কী-যেন-কী নামক একটু দুঃসাধ্য উৎপাত অনুভব করিত। স্ত্রীর কোনো দোষ ছিল না, কোনো ভ্রম ছিল না, তবু স্বামীর কোনো সুখ ছিল না। সে তাহার সহধর্মিণীর শূন্যগহ্বর হৃদয় লক্ষ্য করিয়া কেবল হীরামুক্তার গহনা ঢালিত কিন্তু সেগুলা পড়িত গিয়া লোহার সিন্দুকে, হৃদয় শূন্যই থাকিত। খুড়া দুর্গামোহন ভালোবাসা এত সূক্ষ্ম করিয়া বুঝিত না। এত কাতর হইয়া চাহিত না, এত প্রচুর পরিমাণে দিত না, অথচ খুড়ির নিকট হইতে তাহা অজস্র পরিমাণে লাভ করিত। ব্যবসায়ী হইতে গেলে নব্যবাবু হইলে চলে না এবং স্বামী হইতে গেলে পুরুষ হওয়া দরকার, এ কথায় সন্দেহমাত্র করিবেন না।
ঠিক এই সময়ে শৃগালগুলা নিকটবর্তী ঝোপের মধ্য হইতে অত্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল। মাস্টারমহাশয়ের গল্পস্রোতে মিনিটকয়েকের জন্য বাধা পড়িল। ঠিক মনে হইল, সেই অন্ধকার সভাভূমিতে কৌতুকপ্রিয় শৃগালসম্প্রদায় ইস্কুলমাস্টারের ব্যাখ্যাত দাম্পত্যনীতি শুনিয়াই হউক বা নবসভ্যতাদুর্বল ফণিভূষণের আচরণেই হউক, রহিয়া রহিয়া অট্টহাস্য করিয়া উঠিতে লাগিল। তাহাদের ভাবোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত হইয়া জলস্থল দ্বিগুণতর নিস্তব্ধ হইলে পর মাস্টার সন্ধ্যার অন্ধকারে তাঁহার বৃহৎ উজ্জ্বল চক্ষু পাকাইয়া গল্প বলিতে লাগিলেন—
ফণিভূষণের জটিল এবং বহুবিস্তৃত ব্যবসায়ে হঠাৎ একটা ফাঁড়া উপস্থিত হইল। ব্যাপারটা কী তাহা আমার মতো অব্যবসায়ীর পক্ষে বোঝা এবং বোঝানো শক্ত। মোদ্দা কথা, সহসা কী কারণে বাজারে তাহার ক্রেডিট রাখা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। যদি কেবলমাত্র পাঁচটা দিনের জন্যও সে কোথাও হইতে লাখদেড়েক টাকা বাহির করিতে পারে, বাজারে একবার বিদ্যুতের মতো এই টাকাটার চেহারা দেখাইয়া যায়, তাহা হইলেই মুহূর্তের মধ্যে সংকট উত্তীর্ণ হইয়া তাহার ব্যাবসা পালভরে ছুটিয়া চলিতে পারে।
টাকাটার সুযোগ হইতেছিল না। স্থানীয় পরিচিত মহাজনদের নিকট হইতে ধার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে এরূপ জনরব উঠিলে তাহার ব্যবসায়ের দ্বিগুণ অনিষ্ট হইবে, আশঙ্কায় তাহাকে অপরিচিত স্থানে ঋণের চেষ্টা দেখিতে হইতেছিল। সেখানে উপযুক্ত বন্ধক না রাখিলে চলে না।
গহনা বন্ধক রাখিলে লেখাপড়া এবং বিলম্বের কারণ থাকে না, চট্‌পট্‌ এবং সহজেই কাজ হইয়া যায়।
ফণিভূষণ একবার স্ত্রীর কাছে গেল। নিজের স্ত্রীর কাছে স্বামী যেমন সহজভাবে যাইতে পারে ফণিভূষণের তেমন করিয়া যাইবার ক্ষমতা ছিল না। সে দুর্ভাগ্যক্রমে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসিত, যেমন ভালোবাসা কাব্যের নায়ক কাব্যের নায়িকাকে বাসে; যে ভালোবাসায় সন্তর্পণে পদক্ষেপ করিতে হয় এবং সকল কথা মুখে ফুটিয়া বাহির হইতে পারে না, যে ভালোবাসার প্রবল আকর্ষণ সূর্য এবং পৃথিবীর আকর্ষণের ন্যায় মাঝখানে একটা অতিদূর ব্যবধান রাখিয়া দেয়।
তথাপি তেমন তেমন দায়ে পড়িলে কাব্যের নায়ককেও প্রেয়সীর নিকট হুন্ডি এবং বন্ধক এবং হ্যাণ্ড্‌নোটের প্রসঙ্গ তুলিতে হয়; কিন্তু সুর বাধিয়া যায়, বাক্যস্খলন হয়, এমন-সকল পরিষ্কার কাজের কথার মধ্যেও ভাবের জড়িমা ও বেদনার বেপথু আসিয়া উপস্থিত হয়। হতভাগ্য ফণিভূষণ স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারিল না, ‘ওগো, আমার দরকার হইয়াছে, তোমার গহনাগুলো দাও।’
কথাটা বলিল, অথচ অত্যন্ত দুর্বলভাবে বলিল। মণিমালিকা যখন কঠিন মুখ করিয়া হাঁ-না কিছুই উত্তর করিল না তখন সে একটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আঘাত পাইল কিন্তু আঘাত করিল না। কারণ, পুরুষোচিত বর্বরতা লেশমাত্র তাহার ছিল না। যেখানে জোর করিয়া কাড়িয়া লওয়া উচিত ছিল, সেখানে সে আপনার আন্তরিক ক্ষোভ পর্যন্ত চাপিয়া গেল। যেখানে ভালোবাসার একমাত্র অধিকার, সর্বনাশ হইয়া গেলেও সেখানে বলকে প্রবেশ করিতে দিবে না, এই তাহার মনের ভাব। এ সম্বন্ধে তাহাকে যদি ভর্ৎসনা করা যাইত তবে সম্ভবত সে এইরূপ সূক্ষ্ম তর্ক করিত যে, বাজারে যদি অন্যায় কারণেও আমার ক্রেডিট না থাকে তবে তাই বলিয়া বাজার লুটিয়া লইবার অধিকার আমার নাই, স্ত্রী যদি স্বেচ্ছাপূর্বক বিশ্বাস করিয়া আমাকে গহনা না দেয় তবে তাহা আমি কাড়িয়া লইতে পারি না। বাজারে যেমন ক্রেডিট ঘরে তেমনি ভালোবাসা, বাহুবল কেবলমাত্র রণক্ষেত্রে। পদে পদে এইরূপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তর্কসূত্র কাটিবার জন্যই কি বিধাতা পুরুষমানুষকে এরূপ উদার, এরূপ প্রবল, এরূপ বৃহদাকার করিয়া নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাঁহার কি বসিয়া বসিয়া অত্যন্ত সুকুমার চিত্তবৃত্তিকে নিরতিশয় তনিমার সহিত অনুভব করিবার অবকাশ আছে, না, ইহা তাঁহাকে শোভা পায়।
যাহা হউক, আপন উন্নত হৃদয়বৃত্তির গর্বে স্ত্রীর গহনা স্পর্শ না করিয়া ফণিভূষণ অন্য উপায়ে অর্থ সংগ্রহের জন্য কলিকাতায় চলিয়া গেল।
সংসারে সাধারণত স্ত্রীকে স্বামী যতটা চেনে স্বামীকে স্ত্রী তাহার চেয়ে অনেক বেশি চেনে; কিন্তু স্বামীর প্রকৃতি যদি অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয় তবে স্ত্রীর অনুবীক্ষণে তাহার সমস্তটা ধরা পড়ে না। আমাদের ফণিভূষণকে ফণিভূষণের স্ত্রী ঠিক বুঝিত না। স্ত্রীলোকের অশিক্ষিতপটুত্ব যে-সকল বহুকালাগত প্রাচীন সংস্কারের দ্বারা গঠিত, অত্যন্ত নব্য পুরুষেরা তাহার বাহিরে গিয়া পড়ে। ইহারা এক রকমের! ইহারা মেয়েমানুষের মতোই রহস্যময় হইয়া উঠিতেছে। সাধারণ পুরুষমানুষের যে-কটা বড়ো বড়ো কোটা আছে, অর্থাৎ কেহ-বা বর্বর, কেহ-বা নির্বোধ, কেহ-বা অন্ধ, তাহার মধ্যে কোনোটাতেই ইহাদিগকে ঠিকমতো স্থাপন করা যায় না।
সুতরাৎ মণিমালিকা পরামর্শের জন্য তাহার মন্ত্রীকে ডাকিল। গ্রামসম্পর্কে অথবা দূরসম্পর্কে মণিমালিকার এক ভাই ফণিভূষণের কুঠিতে গোমস্তার অধীনে কাজ করিত। তাহার এমন স্বভাব ছিল না যে কাজের দ্বারা উন্নতি লাভ করে, কোনো-একটা উপলক্ষ্য করিয়া আত্মীয়তার জোরে বেতন এবং বেতনেরও বেশি কিছু কিছু সংগ্রহ করিত।
মণিমালিকা তাহাকে ডাকিয়া সকল কথা বলিল; জিজ্ঞাসা করিল, ‘এখন পরামর্শ কী।’
সে অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো মাথা নাড়িল; অর্থাৎ গতিক ভালো নহে। বুদ্ধিমানেরা কখনোই গতিক ভালো দেখে না। সে কহিল, ‘বাবু কখনোই টাকা সংগ্রহ করিতে পারিবেন না, শেষকালে তোমার এ গহনাতে টান পড়িবেই।’
মণিমালিকা মানুষকে যেরূপ জানিত তাহাতে বুঝিল, এইরূপ হওয়াই সম্ভব এবং ইহাই সংগত। তাহার দুশ্চিন্তা সুতীব্র হইয়া উঠিল। সংসারে তাহার সন্তান নাই; স্বামী আছে বটে কিন্তু স্বামীর অস্তিত্ব সে অন্তরের মধ্যে অনুভব করে না, অতএব যাহা তাহার একমাত্র যত্নের ধন, যাহা তাহার ছেলের মতো ক্রমে ক্রমে বৎসরে বৎসরে বাড়িয়া উঠিতেছে, যাহা রূপকমাত্র নহে, যাহা প্রকৃতই সোনা, যাহা মানিক, যাহা বক্ষের, যাহা কণ্ঠের, যাহা মাথার— সেই অনেকদিনের অনেক সাধের সামগ্রী এক মুহূর্তেই ব্যবসায়ের অতলস্পর্শ গহ্বরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইবে ইহা কল্পনা করিয়া তাহার সর্বশরীর হিম হইয়া আসিল। সে কহিল, ‘কী করা যায়।’
মধুসূদন কহিল, ‘গহনাগুলো লইয়া এইবেলা বাপের বাড়ি চলো।’ গহনার কিছু অংশ, এমন-কি অধিকাংশই যে তাহার ভাগে আসিবে বুদ্ধিমান মধু মনে মনে তাহার উপায় ঠাওরাইল।
মণিমালিকা এ প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইল।
আষাঢ়শেষের সন্ধ্যাবেলায় এই ঘাটের ধারে একখানি নৌকা আসিয়া লাগিল। ঘনমেঘাচ্ছন্ন প্রত্যুষে নিবিড় অন্ধকারে নিদ্রাহীন ভেকের কলরবের মধ্যে একখানি মোটা চাদরে পা হইতে মাথা পর্যন্ত আবৃত করিয়া মণিমালিকা নৌকায় উঠিল। মধুসূদন নৌকার
মধ্য হইতে জাগিয়া উঠিয়া কহিল, ‘গহনার বাক্সটা আমার কাছে দাও।’ মণি কহিল, ‘সে পরে হইবে, এখন নৌকা খুলিয়া দাও।’
নৌকা খুলিয়া দিল, খরস্রোতে হুহু করিয়া ভাসিয়া গেল।
মণিমালিকা সমস্ত রাত ধরিয়া একটি একটি করিয়া তাহার সমস্ত গহনা সর্বাঙ্গ ভরিয়া পরিয়াছে, মাথা হইতে পা পর্যন্ত আর স্থান ছিল না। বাক্সে করিয়া গহনা লইলে সে বাক্স হাতছাড়া হইয়া যাইতে পারে, এ আশঙ্কা তাহার ছিল। কিন্তু গায়ে পরিয়া গেলে তাহাকে না বধ করিয়া সে গহনা কেহ লইতে পারিবে না।
সঙ্গে কোনোপ্রকার বাক্স না দেখিয়া মধুসূদন কিছু বুঝিতে পারিল না, মোটা চাদরের নিচে যে মণিমালিকার দেহপ্রাণের সঙ্গে সঙ্গে দেহপ্রাণের অধিক গহনাগুলি আচ্ছন্ন ছিল তাহা সে অনুমান করিতে পারে নাই! মণিমালিকা ফণিভূষণকে বুঝিত না বটে, কিন্তু মধুসূদনকে চিনিতে তাহার বাকি ছিল না।
মধুসূদন গোমস্তার কাছে একখানা চিঠি রাখিয়া গেল যে, সে কর্ত্রীকে পিত্রালয়ে পৌঁছাইয়া দিতে রওনা হইল। গোমস্তা ফণিভূষণের বাপের আমলের; সে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া হ্রস্ব-ইকারকে দীর্ঘ-ঈকার এবং দন্ত্য-স’কে তালব্য-শ করিয়া মনিবকে এক পত্র লিখিল, ভালো বাংলা লিখিল না কিন্তু স্ত্রীকে অযথা প্রশ্রয় দেওয়া যে পুরুষোচিত নহে, এ কথাটা ঠিকমতোই প্রকাশ করিল।
ফণিভূষণ মণিমালিকার মনের কথাটা ঠিক বুঝিল। তাহার মনে এই আঘাতটা প্রবল হইল যে, আমি গুরুতর ক্ষতিসম্ভাবনা সত্ত্বেও স্ত্রীর অলংকার পরিত্যাগ করিয়া প্রাণপণ চেষ্টায় অর্থসংগ্রহে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তবু আমাকে সন্দেহ। আমাকে আজিও চিনিল না।
নিজের প্রতি যে নিদারুণ অন্যায়ে ক্রুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, ফণিভূষণ তাহাতে ক্ষুব্ধ হইল মাত্র। পুরুষমানুষ বিধাতার ন্যায়দণ্ড, তাহার মধ্যে তিনি বজ্রাগ্নি নিহিত করিয়া রাখিয়াছেন, নিজের প্রতি অথবা অপরের প্রতি অন্যায়ের সংঘর্ষে সে যদি দপ্‌ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতে না পারে তবে ধিক্‌ তাহাকে। পুরুষমানুষ দাবাগ্নির মতো রাগিয়া উঠিবে সামান্য কারণে, আর স্ত্রীলোক শ্রাবণমেঘের মতো অশ্রুপাত করিতে থাকিবে বিনা উপলক্ষে বিধাতা এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, কিন্তু সে আর টেঁকে না।
ফণিভূষণ অপরাধিনী স্ত্রীকে লক্ষ্য করিয়া মনে মনে কহিল, ‘এই যদি তোমার বিচার হয় তবে এইরূপই হউক, আমার কর্তব্য আমি করিয়া যাইব।’ আরো শতাব্দী-পাঁচছয় পরে যখন কেবল অধ্যাত্মশক্তিতে জগৎ চলিবে তখন যাহার জন্মগ্রহণ করা উচিত ছিল সেই ভাবী যুগের ফণিভূষণ ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবতীর্ণ হইয়া সেই আদিযুগের স্ত্রীলোককে বিবাহ করিয়া বসিয়াছে শাস্ত্রে যাহার বুদ্ধিকে প্রলয়ংকরী বলিয়া থাকে। ফণিভূষণ স্ত্রীকে এক-অক্ষর পত্র লিখিল না এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল, এ সম্বন্ধে স্ত্রীর কাছে কখনও সে কোনো কথার উল্লেখ করিবে না। কী ভীষণ দণ্ডবিধি।
দিনদশেক পরে কোনোমতে যথোপযুক্ত টাকা সংগ্রহ করিয়া বিপদুত্তীর্ণ ফণিভূষণ বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল। সে জানিত, বাপের বাড়িতে গহনাপত্র রাখিয়া এতদিনে মণিমালিকা ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে। সেদিনকার দীনপ্রার্থীভাব ত্যাগ করিয়া কৃতকার্য কৃতীপুরুষ স্ত্রীর কাছে দেখা দিলে মণি যে কিরূপ লজ্জিত এবং অনাবশ্যক প্রয়াসের জন্য কিঞ্চিৎ অনুতপ্ত হইবে, ইহাই কল্পনা করিতে করিতে ফণিভূষণ অন্তঃপুরে শয়নাগারের দ্বারের কাছে আসিয়া উপনীত হইল।
দেখিল, দ্বার রুদ্ধ। তালা ভাঙিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, ঘর শূন্য। কোণে লোহার সিন্দুক খোলা পড়িয়া আছে, তাহাতে গহনাপত্রের চিহ্নমাত্র নাই। স্বামীর বুকের মধ্যে ধক্‌ করিয়া একটা ঘা লাগিল! মনে হইল সংসার উদ্দেশ্যহীন এবং ভালোবাসা ও বাণিজ্য-ব্যবসা সমস্তই ব্যর্থ। আমরা এই সংসারপিঞ্জরের প্রত্যেক শলাকার উপরে প্রাণপাত করিতে বসিয়াছি, কিন্তু তাহার ভিতরে পাখি নাই, রাখিলেও সে থাকে না। তবে অহরহ হৃদয়খানির রক্তমানিক ও অশ্রুজলের মুক্তামালা দিয়া কী সাজাইতে বসিয়াছি। এই চিরজীবনের সর্বস্বজড়ানো শূন্য সংসার-খাঁচাটা ফণিভূষণ মনে মনে পদাঘাত করিয়া অতিদূরে ফেলিয়া দিল।
ফণিভূষণ স্ত্রীর সম্বন্ধে কোনোরূপ চেষ্টা করিতে চাহিল না। মনে করিল, যদি ইচ্ছা হয় তো ফিরিয়া আসিবে। বৃদ্ধ ব্রাক্ষ্মণ গোমস্তা আসিয়া কহিল, ‘চুপ করিয়া থাকিলে কী হইবে, কর্ত্রীবধূর খবর লওয়া চাই তো।’ এই বলিয়া মণিমালিকার পিত্রালয়ে লোক পাঠাইয়া দিল। সেখান হইতে খবর আসিল, মণি অথবা মধু এ পর্যন্ত সেখানে পৌঁছে নাই।
তখন চারি দিকে খোঁজ পড়িয়া গেল। নদীতীরে-তীরে প্রশ্ন করিতে করিতে লোক ছুটিল। মধুর তল্লাস করিতে পুলিসে খবর দেওয়া হইল— কোন্‌ নৌকা, নৌকার মাঝি কে, কোন্‌ পথে তাহারা কোথায় চলিয়া গেল, তাহার কোনো সন্ধান মিলিল না।
সর্বপ্রকার আশা ছাড়িয়া দিয়া একদিন ফণিভূষণ সন্ধ্যাকালে তাহার পরিত্যক্ত শয়নগৃহের মধ্যে প্রবেশ করিল। সেদিন জন্মাষ্টমী, সকাল হইতে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়িতেছে। উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামের প্রান্তরে একটা মেলা বসে, সেখানে আটচালার মধ্যে বারোয়ারির যাত্রা আরম্ভ হইয়াছে। মুষলধারায় বৃষ্টিপাতশব্দে যাত্রার গানের সুর মৃদুতর হইয়া কানে আসিয়া প্রবেশ করিতেছে। ঐ-যে বাতায়নের উপরে শিথিলকব্জা দরজাটা ঝুলিয়া পড়িয়াছে ঐখানে ফণিভূষণ অন্ধকারে একলা বসিয়াছিল— বাদলার হাওয়া, বৃষ্টির ছাট এবং যাত্রার গান ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতেছিল, কোনো খেয়ালই ছিল না। ঘরের দেওয়ালে আর্টস্টুডিয়ো-রচিত লক্ষ্মীসরস্বতীর একজোড়া ছবি টাঙানো; আলনার উপরে একটি গামছা ও তোয়ালে, একটি চুড়িপেড়ে ও একটি ডুরে শাড়ি সদ্যব্যবহারযোগ্যভাবে পাকানো ঝুলানো রহিয়াছে। ঘরের কোণে টিপাইয়ের উপরে পিতলের ডিবায় মণিমালিকার স্বহস্তরচিত গুটিকতক পান শুষ্ক হইয়া পড়িয়া আছে। কাচের আলমারির মধ্যে তাহার আবাল্যসঞ্চিত চীনের পুতুল, এসেন্সের শিশি, রঙিন কাচের ডিক্যাণ্টার, শৌখিন তাস, সমুদ্রের বড়ো বড়ো কড়ি, এমন-কি, শূন্য সাবানের বাক্সগুলি পর্যন্ত অতি পরিপাটি করিয়া সাজানো; যে অতিক্ষুদ্র গোলকবিশিষ্ট ছোটো শখের কেরোসিন-ল্যাম্প সে নিজে প্রতিদিন প্রস্তুত করিয়া স্বহস্তে জ্বালাইয়া কুলুঙ্গিটির উপর রাখিয়া দিত তাহা যথাস্থানে নির্বাপিত এবং ম্লান হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, কেবল সেই ক্ষুদ্র ল্যাম্পটি এই শয়নকক্ষে মণিমালিকার শেষমুহূর্তের নিরুত্তর সাক্ষী; সমস্ত শূন্য করিয়া যে চলিয়া যায়, সেও এত চিহ্ন এত ইতিহাস, সমস্ত জড়সামগ্রীর উপর আপন সজীব হৃদয়ের এত স্নেহস্বাক্ষর রাখিয়া যায়! এসো মণিমালিকা, এসো, তোমার দীপটি তুমি জ্বালাও, তোমার ঘরটি তুমি আলো করো, আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া তোমার যত্নকুঞ্চিত শাড়িটি তুমি পরো, তোমার জিনিসগুলি তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তোমার কাছ হইতে কেহ কিছু প্রত্যাশা করে না, কেবল তুমি উপস্থিত হইয়া মাত্র তোমার অক্ষয় যৌবন তোমার অম্লান সৌন্দর্য লইয়া চারিদিকের এই-সকল বিপুল বিক্ষিপ্ত অনাথ জড়সামগ্রীরাশিকে একটি প্রাণের ঐক্যে সঞ্জীবিত করিয়া রাখো; এই-সকল মূক প্রাণহীন পদার্থের অব্যক্ত ক্রন্দন গৃহকে শ্মশান করিয়া তুলিয়াছে।
গভীর রাত্রে কখন্‌ একসময়ে বৃষ্টির ধারা এবং যাত্রার গান থামিয়া গেছে। ফণিভূষণ জানলার কাছে যেমন বসিয়া ছিল তেমনি বসিয়া আছে। বাতায়নের বাহিরে এমন একটা জগদ্‌ব্যাপী নীরন্ধ্র অন্ধকার যে তাহার মনে হইতেছিল, যেন সম্মুখে যমালয়ের একটা অভ্রভেদী সিংহদ্বার যেন এইখানে দাঁড়াইয়া কাঁদিয়া ডাকিলে চিরকালের লুপ্ত জিনিস অচিরকালের মতো একবার দেখা দিতেও পারে। এই মসীকৃষ্ণ মৃত্যুর পটে এই অতি কঠিন নিকষ-পাষাণের উপর এই হারানো সোনার একটি রেখা পড়িতেও পারে।
এমনসময় একটা ঠক্‌ঠক্‌ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে গহনার ঝম্‌ঝম্‌ শব্দ শোনা গেল। ঠিক মনে হইল শব্দটা নদীর ঘাটের উপর হইতে উঠিয়া আসিতেছে। তখন নদীর জল এবং রাত্রির অন্ধকার এক হইয়া মিশিয়া গিয়াছিল। পুলকিত ফণিভূষণ দুই উৎসুক চক্ষু দিয়া অন্ধকার ঠেলিয়া ঠেলিয়া ফুঁড়িয়া ফুঁড়িয়া দেখিতে চেষ্টা করিতে লাগিল— স্ফীত হৃদয় এবং ব্যগ্র দৃষ্টি ব্যথিত হইয়া উঠিল, কিছুই দেখা গেল না। দেখিবার চেষ্টা যতই একান্ত বাড়িয়া উঠিল অন্ধকার ততই যেন ঘনীভূত, জগৎ ততই যেন ছায়াবৎ হইয়া আসিল। প্রকৃতি নিশীথরাত্রে আপন মৃত্যুনিকেতনের গবাক্ষদ্বারে অকস্মাৎ অতিথিসমাগম দেখিয়া দ্রুত হস্তে আরো একটা বেশি করিয়া পর্দা ফেলিয়া দিল।
শব্দটা ক্রমে ঘাটের সর্বোচ্চ সোপানতল ছাড়িয়া বাড়ির দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। বাড়ির সম্মুখে আসিয়া থামিল। দেউড়ি
বন্ধ করিয়া দরোয়ান যাত্রা শুনিতে গিয়াছিল। তখন সেই রুদ্ধ দ্বারের উপর ঠক্‌ঠক্‌ ঝম্‌ঝম্‌ করিয়া ঘা পড়িতে লাগিল, যেন অলংকারের সঙ্গে সঙ্গে একটা শক্ত জিনিস দ্বারের উপর আসিয়া পড়িতেছে। ফণিভূষণ আর থাকিতে পারিল না। নির্বাণদীপ কক্ষগুলি পার হইয়া অন্ধকার সিঁড়ি দিয়া নামিয়া রুদ্ধ দ্বারের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। দ্বার বাহির হইতে তালাবন্ধ ছিল। ফণিভূষণ প্রাণপণে দুই হাতে সেই দ্বার নাড়া দিতেই সেই সংঘাতে এবং তাহার শব্দে চমকিয়া জাগিয়া উঠিল। দেখিতে পাইল, সে নিদ্রিত অবস্থায় উপর হইতে নিচে নামিয়া আসিয়া ছিল। তাহার সর্বশরীর ঘর্মাক্ত, হাত পা বরফের মতো ঠাণ্ডা এবং হৃৎপিন্ড নির্বাণোম্মুখ প্রদীপের মতো স্ফুরিত হইতেছে। স্বপ্ন ভাঙিয়া দেখিল, বাহিরে আর কোনো শব্দ নাই, কেবল শ্রাবণের ধারা তখনও ঝর্‌‌‌ঝর্‌‌‌ শব্দে পড়িতেছিল এবং তাহারই সহিত মিশ্রিত হইয়া শুনা যাইতেছিল যাত্রার ছেলেরা ভোরের সুরে তান ধরিয়াছে ।
যদিচ ব্যাপারটা সমস্তই স্বপ্ন কিন্তু এত অধিক নিকটবর্তী এবং সত্যবৎ যে ফণিভূষণের মনে হইল, যেন অতি অল্পের জন্যই সে তাহার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষার আশ্চর্য সফলতা হইতে বঞ্চিত হইল। সেই জলপতনশব্দের সহিত দূরাগত ভৈরবীর তান তাহাকে বলিতে লাগিল, এই জাগরণই স্বপ্ন, এই জগৎই মিথ্যা।
তাহার পরদিনেও যাত্রা ছিল এবং দরোয়ানেরও ছুটি ছিল। ফণিভূষণ হুকুম দিল, আজ সমস্ত রাত্রি যেন দেউড়ির দরজা খোলা থাকে। দরোয়ান কহিল, ‘মেলা উপলক্ষ্যে নানা দেশ হইতে নানা প্রকারের লোক আসিয়াছে, দরজা খোলা রাখিতে সাহস হয় না।’ ফণিভূষণ সে কথা মানিল না। দরোয়ান কহিল, ‘তবে আমি সমস্ত রাত্রি হাজির থাকিয়া পাহারা দিব।’ ফণিভূষণ কহিল, ‘সে হইবে না, তোমাকে যাত্রা শুনিতে যাইতেই হইবে।’ দরোয়ান আশ্চর্য হইয়া গেল।
পরদিন সন্ধ্যাবেলায় দীপ নিভাইয়া দিয়া ফণিভূষণ তাহার শয়নকক্ষের সেই বাতায়নে আসিয়া বসিল। আকাশে অবৃষ্টিসংরম্ভ মেঘ এবং চতুর্দিকে কোনো-একটি অনির্দিষ্ট আসন্নপ্রতীক্ষার নিস্তব্ধতা। ভেকের অশ্রান্ত কলরব এবং যাত্রার গানের চিৎকারধ্বনি সেই স্তব্ধতা ভাঙিতে পারে নাই, কেবল তাহার মধ্যে একটা অসংগত অদ্ভুতরস বিস্তার করিতেছিল।
অনেকরাত্রে একসময়ে ভেক এবং ঝিল্লি এবং যাত্রার দলের ছেলেরা চুপ করিয়া গেল এবং রাত্রের অন্ধকারের উপরে আরো একটা কিসের অন্ধকার আসিয়া পড়িল। বুঝা গেল, এইবার সময় আসিয়াছে।
পূর্বদিনের মতো নদীর ঘাটে একটা ঠক্‌ঠক্‌ এবং ঝম্‌ঝম্‌ শব্দ উঠিল। কিন্তু ফণিভূষণ সে দিকে চোখ ফিরাইল না। তাহার ভয় হইল, পাছে অধীর ইচ্ছা এবং অশান্ত চেষ্টায় তাহার সকল ইচ্ছা, সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া যায়। পাছে আগ্রহের বেগ তাহার ইন্দ্রিয়শক্তিকে অভিভূত করিয়া ফেলে। সে আপনার সকল চেষ্টা নিজের মনকে দমন করিবার জন্য প্রয়োগ করিল, কাঠের মূর্তির মতো শক্ত হইয়া স্থির হইয়া বসিয়া রহিল।
শিঞ্জিত শব্দ আজ ঘাট হইতে ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া মুক্ত দ্বারের মধ্যে প্রবেশ করিল। শুনা গেল, অন্দরমহলের গোলসিঁড়ি দিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে শব্দ উপরে উঠিতেছে। ফণিভূষণ আপনাকে আর দমন করিতে পারে না, তাহার বক্ষ তুফানের ডিঙির মতো আছাড় খাইতে লাগিল এবং নিশ্বাস রোধ হইবার উপক্রম হইল। গোলসিঁড়ি শেষ করিয়া সেই শব্দ বারান্দা দিয়া ক্রমে ঘরের নিকটবর্তী হইতে লাগিল। অবশেষে ঠিক সেই শয়নকক্ষের দ্বারের কাছে আসিয়া খট্‌খট্‌ এবং ঝম্‌ঝম্‌ থামিয়া গেল। কেবল চৌকাঠটি পার হইলেই হয়।
ফণিভূষণ আর থাকিতে পারিল না। তাহার রুদ্ধ আবেগ এক মুহূর্তে প্রবলবেগে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল, সে বিদ্যুৎবেগে চৌকি হইতে উঠিয়া কাঁদিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল, ‘মণি!’ অমনি সচকিত হইয়া জাগিয়া দেখিল, তাহারই সেই ব্যাকুল কণ্ঠের চিৎকারে ঘরের শাসিগুলা পর্যন্ত ধ্বনিত স্পন্দিত হইতেছে। বাহিরে সেই ভেকের কলরব এবং যাত্রার ছেলেদের ক্লিষ্ট কণ্ঠের গান।
ফণিভূষণ নিজের ললাটে সবলে আঘাত করিল।
পরদিন মেলা ভাঙিয়া গেছে। দোকানি এবং যাত্রার দল চলিয়া গেল। ফণিভূষণ হুকুম দিল, সেদিন সন্ধ্যার পর তাহার বাড়িতে সে নিজে ছাড়া আর কেহই থাকিবে না। চাকরেরা স্থির করিল, বাবু তান্ত্রিকমতে একটা কী সাধনে নিযুক্ত আছেন। ফণিভূষণ সমস্তদিন উপবাস করিয়া রহিল।
জনশূন্য বাড়িতে সন্ধ্যাবেলায় ফণিভূষণ বাতায়নতলে আসিয়া বসিল। সেদিন আকাশের স্থানে স্থানে মেঘ ছিল না, এবং ধৌত নির্মল বাতাসের মধ্য দিয়া নক্ষত্রগুলিকে অত্যুজ্জ্বল দেখাইতেছিল। কৃষ্ণপক্ষ দশমীর চাঁদ উঠিতে অনেক বিলম্ব আছে। মেলা উত্তীর্ণ হইয়া যাওয়াতে পরিপূর্ণ নদীতে নৌকা মাত্রই ছিল না এবং উৎসব-জাগরণক্লান্ত গ্রাম দুইরাত্রি জাগরণের পর আজ গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন।
ফণিভূষণ একখানা চৌকিতে বসিয়া চৌকির পিঠের উপর মাথা ঊর্ধ্বমুখ করিয়া তারা দেখিতেছিল; ভাবিতেছিল, একদিন যখন তাহার বয়স ছিল উনিশ, যখন কলিকাতার কালেজে পড়িত, যখন সন্ধ্যাকালে গোলদিঘির তৃণশয়নে চিত হইয়া হাতের উপরে মাথা রাখিয়া ঐ অনন্তকালের তারাগুলির দিকে চাহিয়া থাকিত এবং মনে পড়িত তাহার সেই নদীকূলবর্তী শ্বশুরবাড়ির একটি বিরলকক্ষে চোদ্দবৎসরের বয়ঃসন্ধিগতা মণির সেই উজ্জ্বল কাঁচা মুখখানি, তখনকার সেই বিরহ কী সুমধূর, তখনকার সেই তারাগুলির আলোকস্পন্দন হৃদয়ের যৌবনস্পন্দনের সঙ্গে সঙ্গে কী বিচিত্র ‘বসন্তরাগেণ যতিতালাভ্যাং’ বাজিয়া বাজিয়া উঠিত! আজ সেই একই তারা আগুন দিয়া আকাশে মোহমুদগরের শ্লোক কয়টা লিখিয়া রাখিয়াছে; বলিতেছে, ‘সংসারোহয়মতীব বিচিত্রঃ!’
দেখিতে দেখিতে তারাগুলি সমস্ত লুপ্ত হইয়া গেল। আকাশ হইতে একখানা অন্ধকার নামিয়া এবং পৃথিবী হইতে একখানা অন্ধকার উঠিয়া চোখের উপরকার এবং নিচেরকার পল্লবের মতো একত্র আসিয়া মিলিত হইল। আজ ফণিভূষণের চিত্ত শান্ত ছিল। সে নিশ্চয় জানিত, আজ তাহার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে, সাধকের নিকট মৃত্যু আপন রহস্য উদ্‌ঘাটন করিয়া দিবে।
পূর্বরাত্রির মতো সেই শব্দ নদীর জলের মধ্য হইতে ঘাটের সোপানের উপর উঠিল। ফণিভূষণ দুই চক্ষু নিমীলিত করিয়া স্থির দৃঢ়চিত্তে ধ্যানাসনে বসিল। শব্দ দ্বারীশূন্য দেউড়ির মধ্যে প্রবেশ করিল, শব্দ জনশূন্য অন্তঃপুরের গোলসিঁড়ির মধ্য দিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া উঠিতে লাগিল, শব্দ দীর্ঘ বারান্দা পার হইল, এবং শয়নকক্ষের দ্বারের কাছে আসিয়া ক্ষণকালের জন্য থামিল।
ফণিভূষণের হৃদয় ব্যাকুল এবং সর্বাঙ্গ কণ্টকিত হইয়া উঠিল, কিন্তু আজ সে চক্ষু খুলিল না। শব্দ চৌকাঠ পার হইয়া অন্ধকার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। আলনায় যেখানে শাড়ি কোঁচানো আছে, কুলুঙ্গিতে যেখানে কেরোসিনের দীপ দাঁড়াইয়া, টিপাইয়ের ধারে যেখানে পানের বাটায় পান শুষ্ক, এবং সেই বিচিত্রসামগ্রীপূর্ণ আলমারির কাছে প্রত্যেক জায়গায় এক-একবার করিয়া দাঁড়াইয়া অবশেষে শব্দটা ফণিভূষণের অত্যন্ত কাছে আসিয়া থামিল।
তখন ফণিভূষণ চোখ মেলিল এবং দেখিল, ঘরে নবোদিত দশমীর চন্দ্রালোক আসিয়া প্রবেশ করিয়াছে, এবং তাহার চৌকির ঠিক সম্মুখে একটি কঙ্কাল দাঁড়াইয়া। সেই কঙ্কালের আট আঙুলে আংটি, করতলে রতনচক্র, প্রকোষ্ঠে বালা, বাহুতে বাজুবন্ধ, গলায় কণ্ঠি, মাথায় সিঁথি, তাহার আপাদমস্তকে অস্থিতে অস্থিতে এক-একটি আভরণ সোনায় হীরায় ঝক্‌ঝক্‌ করিতেছে। অলংকারগুলি ঢিলা, ঢল্‌ঢল্‌ করিতেছে, কিন্তু অঙ্গ হইতে খসিয়া পড়িতেছে না। সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর, তাহার অস্থিময় মুখে তাহার দুই চক্ষু ছিল সজীব; সেই কালো তারা, সেই ঘনদীর্ঘ পক্ষ্ম, সেই সজল উজ্জ্বলতা, সেই অবিচলিত দৃঢ়শান্তি দৃষ্টি। আজ আঠারো বৎসর পূর্বে একদিন আলোকিত সভাগৃহে নহবতের সাহানা-আলাপের মধ্যে ফণিভূষণ যে দুটি আয়ত সুন্দর কালো-কালো ঢলঢল চোখ শুভদৃষ্টিতে প্রথম দেখিয়াছিল সেই দুটি চক্ষুই আজ শ্রাবণের অর্ধরাত্রে কৃষ্ণপক্ষ দশমীর চন্দ্রকিরণে দেখিল, দেখিয়া তাহার সর্বশরীরের রক্ত হিম হইয়া আসিল। প্রাণপণে দুই চক্ষু বুজিতে চেষ্টা করিল, কিছুতেই পারিল না; তাহার চক্ষু মৃত মানুষের চক্ষুর মতো নির্নিমেষ চাহিয়া রহিল।
তখন সেই কঙ্কাল স্তম্ভিত ফণিভূষণের মুখের দিকে তাহার দৃষ্টি স্থির রাখিয়া দক্ষিণ হস্ত তুলিয়া নীরবে অঙ্গুলিসংকেতে ডাকিল। তাহার চার আঙুলের অস্তিতে হীরার আংটি ঝক্‌মক করিয়া উঠিল।
ফণিভূষণ মূঢ়ের মতো উঠিয়া দাঁড়াইল। কঙ্কাল দ্বারের অভিমুখে চলিল; হাড়েতে হাড়েতে গহনায় গহনায় কঠিন শব্দ হইতে লাগিল। ফণিভূষণ পাশবদ্ধ পুত্তলীর মতো তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল। বারান্দা পার হইল, নিবিড় অন্ধকার গোলসিঁড়ি ঘুরিয়া ঘুরিয়া খট্‌খট্‌ ঠক্‌ঠক্‌ ঝম্‌ঝম্‌ করিতে করিতে নিচে উত্তীর্ণ হইল। নিচেকার বারান্দা পার হইয়া জনশূন্য দীপহীন দেউড়িতে প্রবেশ করিল। অবশেষে দেউড়ি পার হইয়া ইটের-খোয়া-দেওয়া বাগানের রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল। খোয়াগুলি অস্থিপাতে কড়্‌কড়্‌ করিতে লাগিল। সেখানে ক্ষীণ জ্যোৎস্না ঘন ডালপালার মধ্যে আটক খাইয়া কোথাও নিষ্কৃতির পথ পাইতেছিল না; সেই বর্ষার নিবিড়গন্ধ অন্ধকার ছায়াপথে জোনাকির ঝাঁকের মধ্য দিয়া উভয়ে নদীর ঘাটে আসিয়া উপস্থিত হইল।
ঘাটের যে ধাপ বাহিয়া শব্দ উপরে উঠিয়াছিল সেই ধাপ দিয়া অলংকৃত কঙ্কাল তাহার আন্দোলনহীন ঋজুগতিতে কঠিন শব্দ করিয়া এক-পা এক-পা নামিতে লাগিল। পরিপূর্ণ বর্ষানদীর প্রবলস্রোত জলের উপর জ্যোৎস্নার একটি দীর্ঘরেখা ঝিক্‌ঝিক্‌ করিতেছে।
কঙ্কাল নদীতে নামিল, অনুবর্তী ফণিভূষণও জলে পা দিল। জলস্পর্শ করিবামাত্র ফণিভূষণের তন্দ্রা ছুটিয়া গেল। সম্মুখে আর তাহার পথপ্রদর্শক নাই, কেবল নদীর পরপারে গাছগুলা স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া এবং তাহাদের মাথার উপরে খণ্ড চাঁদ শান্ত অবাক্‌ভাবে চাহিয়া আছে। আপাদমস্তক বারংবার শিহরিয়া শিহরিয়া স্খলিতপদে ফণিভূষণ স্রোতের মধ্যে পড়িয়া গেল। যদিও সাঁতার জানিত কিন্তু স্নায়ু তাহার বশ মানিল না, স্বপ্নের মধ্য হইতে কেবল মুহূর্তমাত্র জাগরণের প্রান্তে আসিয়া পরক্ষণে অতলস্পর্শ সুপ্তির মধ্যে নিমগ্ন হইয়া গেল।
গল্প শেষ করিয়া ইস্কুলমাস্টার খানিকক্ষণ থামিলেন। হঠাৎ থামিবামাত্র বোঝা গেল, তিনি ছাড়া ইতিমধ্যে জগতের আর-সকলই নীরব নিস্তব্ধ হইয়া গেছে। অনেকক্ষণ আমি একটি কথাও বলিলাম না এবং অন্ধকারে তিনি আমার মুখের ভাব দেখিতে পাইলেন না।
আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কি এ গল্প বিশ্বাস করিলেন না।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কি ইহা বিশ্বাস করেন।”
তিনি কহিলেন, “না। কেন করি না তাহার কয়েকটি যুক্তি দিতেছি। প্রথমত, প্রকৃতিঠাকুরানী উপন্যাসলেখিকা নহেন, তাঁহার হাতে বিস্তর কাজ আছে—”
আমি কহিলাম, “দ্বিতীয়ত, আমারই নাম শ্রীযুক্ত ফণিভূষণ সাহা।”
ইস্কুলমাস্টার কিছুমাত্র লজ্জিত না হইয়া কহিলেন, “আমি তাহা হইলে ঠিকই অনুমান করিয়াছিলাম। আপনার স্ত্রীর নাম কী ছিল।”
আমি কহিলাম, “নৃত্যকালী।”


Thursday, June 9, 2016

হারবেন কেন, আপনি জিতবেন

আজকের লেখা তাদের জন্য যারা নিজেকে ব্যর্থ ভাবে, ভাবে সে হেরে গ্যাছে। তাহলে শুরু করি আজকের হার জিতের গল্প।
মেয়েটা যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন একটা ছেলেকে প্রোপজ করেছিল। মনে মনে তাকে সে খুব ভালোবাসতো।
মেয়েটা বর্ণে কালো হওয়ার কারণে ঐ ছেলেটা তাকে রিজেক্ট করে দেয়।
মেয়েদের বুক ফাঁটে তবু মুখ ফোটে না।
কিন্তু মেয়েটির মুখ ফুটেছিল বলেই হয়তো এই লজ্জার স্বীকার হতে হয়েছে।
মেয়েটা কিছুতেই এই বিষয়টা মানতে পারছিল না।
নিজেকে সামলে রাখতে খুব চেস্টা করত কিন্তু তবুও সারারাত কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাতো।
সব সময় মন খারাপ করে থাকতো।
শেষে মেয়েটা নিজের মধ্যে প্রচুর জেদ তৈরি করলো।
প্রচুর লেখা-পড়া শুরু করল কারণ তাকে যে অনেক বড় হতে হবে।
অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম হয়ে গেল।
বাবা-মা জোর করে বিদেশ ফেরত এক ছেলের সাথে মেয়েটার বিয়ে ঠিক করে ফেললো।
মেয়েটা যে কালো, আইবুড়ো হয়ে গেলে কেউ এই মেয়েকে বিয়ে করবে না। তাই ,বাবা-মা বিয়েটা ঠিক করলো।
কিন্তু মেয়েটা তার বাবা-মাকে ভয় দেখালো যে , বিয়ে দিলে সে গলায় দঁড়ি দেবে।
মেয়েটা মনে মনে বললো , সে যেদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে ঠিক সেদিন-ই বিয়ে করবে।
যেই কথা সেই কাজ। জীবন যুদ্ধে নেমে গেল।
নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে গেল। ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়িয়ে নিজের লেখা -পড়ার খরচ চালাত।
বাড়ি থেকে টাকা চাইতো না।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় বোর্ড স্ট্যান্ড করলো অঁজপাড়া গাঁয়ের একটা স্কুল থেকে।
এরপর মফস্বলের হাই স্কুল থেকে এইচ এস তেও বোর্ড স্ট্যান্ড।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে পড়াশুনা শেষ করে ঐ কালো মেয়েটা এখন হাইকোর্টের জর্জ।
মেয়েটার ক'দিন আগেই বিয়ে হয়েছে। ছেলে একজন ডিসি।
যে ছেলেটা ঐ মেয়ের প্রোপোজ ফিরিয়ে দিয়েছিল সে এখন গার্মেন্টস-এ চাকরী করে।
আসলে , যারা মানুষকে ফিরিয়ে দেয় তারা কখনো বড় হতে পারে না।
যারা আঘাত পেয়ে ফিরে যায় তারাই যুগে যুগে বড় হয়।
জীবনে জেদ থাকলে অনেক উঁচুতে ওঠা যায়।
সবাই তো সুন্দরীদের পেছনেই ছোটে। সাদা- কালো আপেক্ষিক।
নিজের ভেতর প্রচুর জেদ তৈরি করুন।
যেখানে হোচট খাবেন , সেখান থেকেই উঠে দাঁড়ান। জীবনে ঝড় আসবেই। ব্যর্থতা থাকবেই।
জীবনে সবচেয়ে ভালো জায়গায় যেতে চাইলে জেদ করতে শিখুন।
আপনাকে ছাড়িয়ে যান। আপনার সাফল্য নিশ্চিত।

Thursday, June 2, 2016

মুখ দেখে মানুষ চেনা যায়না

ভালো মানুষেরা কখনই বলে বেড়াই না যে সে ভালো।
তারা ক্রেডিট নিতেও চাই না, কিন্তু খারাপ কিছু ধান্দাবাজ লোক অন্যের ক্রেডিট নিজের বলে চালিয়ে দেবে।
আপনি বুঝতেও পারবেন না যে সে খারাপ লোক। কারন তার কথায় বেশ পটু হয়।
যাই হোক আজকের গল্প শুরু করি।
অটোতে করে একটা কাজে যাচ্ছিলাম।
একটু পরেই একটা মেয়ে হাত নেড়ে অটো থামালো।
মেয়েটা উঠে আমার পাশের সিটটাতে বসল। কিউট একটা মেয়ে। সুন্দর করে চুলগুলো আঁচড়ানো।
একটু পরপরই আমার হাতের হ্যান্ডসেটটার দিকে তাকাচ্ছে।
না, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। ও আসলে একটা বাচ্চা মেয়ে। বয়স হয়তো ছয় বছর হবে।
আমি বললাম "বারবার মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছো কিছু বলবে?"
মেয়েটি হাসি দিয়ে বলল "আমার বাবার ফোনটাও আপনারটার মত আংকেল।"
মেয়েটার মুখে সুন্দর করে আংকেল ডাক শুনতে ভালোই লাগলো। বললাম "কোথায় যাবে?"
বলে "যেখানে অটো থামবে সেখানে। আটো ড্রাইভার আংকেল আমার বাবাকে চেনে। বাবা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য"।
বাহ! মেয়েটাতো ভারী সুন্দর করে কথা বলতে পারে। কথা বলতে বলতে অটোর গন্তব্য শেষ। আমিও নামলাম, নামলো মেয়েটাও।
একটু দূরেই দেখি আমার পুরনো একটা ফ্রেন্ড দাড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই আমাকে জড়িয়ে ধরল।
অনেক দিন পর দেখা আপ্লুত হয়ে বলে - কতদিন পর দেখা। কেমন আছিসরে?
  • ভালোই। তুই কেমন ?
  • আমিও ভালো। আচ্ছা তুই ওই অটোটা করে এলিনা?
  • হ্যা।
  • ওটাতে একটা বাচ্চা আসার কথা।
  • একটা বাচ্চা এসেছে। তোর কি হয়? ছোট বোন?
  • আরে না।
  • ভাতিজি?
  • না।
  • তাহলে?
  • ও আমার মেয়ে। আমার পৃথিবী।
বেশ অবাক হলাম!
বললাম, বলিস কি তুই বিয়ে করেছিস। আবার এতবড় একটা মেয়েও!
ততক্ষনে পাপা বলে মেয়েটা দৌড়ে এসে ওর বাবাকে আঁকড়ে ধরলো। বেশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। বুকের সাথে মিশিয়ে নিল বাচ্চাটাকে।
একটা হোটেলে ঢুকলাম। বাচ্চাটা খাচ্ছিল। বন্ধুর মুখটা বেশ মলিন। আমার সিটে ওকে ডেকে আনলাম যাতে বাচ্চাটা যেন কিছু না শোনে।
বললাম, আসলে মেয়েটা কে? কেন যেন আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা তোর মেয়ে!
"আসলে আমার দাদার মেয়ে। ওর মায়ের বিয়ের পাঁচ মাস পর ওর বাবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
ওর ভাগ্যটা এতই খারাপ যে, জন্মের সাত মাস পর মাকেও হারায়। তুইতো জানিস আমার বাবা মা নেই। আমি তখন একা আর ওর ববাতো পাগলই।
সবাই যখন মেয়েটাকে অন্য কাউকে দেবার কথা ভাবছে। কেউ কেউ নেবার জন্য এসেছিলও।
কেন যেন আমার কাছে খুব কষ্ট লেগেছিল। আমি কাউকে দেইনি ওকে। নিজের হাতে ওকে বড় করতে লাগলাম।
আজ ও এত বড় হয়েছে। বুঝতে শেখার পর থেকেই ওর বাবাকে দেখলে ভয় পায়। আমাকেই বাবা বলে ডাকে।
জানিস আমাকে যখন বাবা বলে ডাকে আমি সব কিছু ভুলে যাই। ও এক নাগাড়ে বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।
মেয়েটা উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলে "কাঁদছো কেন পাপা?"
কোনভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল "কিছুনা মা। চোখে কি যেন পড়েছে"।
বাচ্চা এই মেয়েটা বাবাকে ওড়না মুখে নিয়ে ফুঁ দিয়ে গরম করে চোখ মুছে দিচ্ছে।
আমি একটি কথাও বলতে পারিনি। চুপচাপ বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ঠিকানাটা রেখে দিলাম। অবশ্যই সময় অসময়ে যাবো।
মেয়েটার প্রতি আমারও বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছে।
ভালো মানুষকে, পরিস্থিতি আমাদের সামনে তুলে ধরে। কখনো কখনো ভালো মানুষের মানুষিকতা প্রকাশের জন্য কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়না।
আর আমরা জানতেও পারিনা চোখের সামনে থাকা একটা মানুষও হতে পারে মহত্বের প্রতীক।

Wednesday, June 1, 2016

ছেড়ে যেতে দিবিনা

আজ আপনাদের জন্য একটা ভালোবাসার গল্প।
আর একটা কথাই বলব, 
একজন রাগ করে থাকলে, অপরজনকে রাগ ভুলে গিয়ে অন্যজনকে মানানোর চেস্টা করতে হবে।
নাহলে সে সম্পর্কে তিক্ততা আসবেই।
যাকে ভালোবাসি তার সামনে মাথা নিচু করতে যদি ইগো হার্ট হয় তাহোলে সম্ভব না।
- তোমার কাছে আমার যা যা আছে সব কিছু ফেরত নিয়ে আসবে, কিচ্ছু বাদ রাখবেনা।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তুমিও আমার সব কিছু নিয়ে এসো।
- হুম, তোমার ফোনে যে গতকাল ২০ টাকা রিচার্জ করে দিয়েছিলাম, আসতে একটা ২০ টাকার কার্ডও নিয়ে আসবা মনে করে।
- আচ্ছা ঠিক আছে, রাখি... বাই!!

কিছুটা রাগ ও বিষন্ন মনে ফোনের লাইনটা কেটে দেয় মোহিত। মেয়েটা এমন কেন !?
সামান্য ব্যাপারেই রাগারাগি করে কিন্তু আজ সে ব্রেকাপ চাচ্ছে !! 
বেশী বাড়াবাড়ি অসহ্য লাগে মোহিতের।

নিজ থেকে সরি টরি বোলে, হাতে পায়ে ধরে গার্লফ্রেন্ড কে ঠান্ডা করার মত ছেলে না মোহিত।
সুস্মিতা যদি ব্রেকাপ করতে পারে সে কেন পারবে না!? 
মোহিত কাঁপা কাঁপা হাতে সুস্মিতার দেয়া সব গিফট এবং ফটো গুলো একটা ব্যাগে গোছাচ্ছে। 
আজ বিকেলেই এগুলো নিয়ে দেখা করতে হবে।
আজই শেষ দেখা। আজই ব্রেকাপ।

ধানমন্ডি লেকের সেই জায়গাটিতেই বসে আছে সুস্মিতা, যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো।
ফেরত আনা জিনিস গুলোর ব্যাগ হাতে সুস্মিতার পাশে এসে দাঁড়ালো মোহিত। 
সুস্মিতা অন্য দিকে তাকিয়ে বললো,
- সব কিছু ঠিক ঠাক এনেছো তো ?
- হুম এনেছি।
- ভেরী গুড। এই যে আমার ব্যাগটা ধরো, এখানে তোমার দেয়া সব কিছু আছে।
সুস্মিতা উঠে দাঁড়িয়ে তার ব্যাগটা মোহিতের হাতে দেয়, মোহিতও তার হাতে থাকা ব্যাগটা এগিয়ে দেয় সুস্মিতার
দিকে। 
“ভালো থেকো, আর নিজের প্রতি খেয়াল রেখো” —বলেই মোহিতের সামনে থেকে হনহন করে চলে যায় সুস্মিতা।
মোহিত কিছু বলতে পারে না। স্তব্ধ হয়ে সেই জায়গাটিতেই নির্বাক হয়ে বসে পড়ে। 
সুস্মিতা সত্যি সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে গেল...!

এক ধরনের শূন্যতা এসে ভর করতে শুরু করলো মোহিতের বুকের ভিতর। 
মহা মূল্যবান একটা জিনিস হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছে সে।
পৃথিবীটা কেমনযেন একদম ছোট হয়ে আসছে তার।
মোহিত চুপটি করে সেখানে বসেই রইলো। কতক্ষণ মনে নেই।

খানিক বাদেই হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে একজন পেছন থেকে এসে মোহিতে শার্টের কলার চেপে ধরলো। 
সেই কেউ একজন আর কেউ নয় সুস্মিতা’। 
মেয়েটার চোখমুখ একদম লাল হয়ে আছে, বাচ্চাদের মত ফোঁপাচ্ছে। 
মোহিতকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সুস্মিতা একটানা বলতে শুরু করলো -
“তুমি আমাকে একটাবারও ফেরালে না কেন? ব্রেকাপ টা যেন না করি সে চেষ্টা করলে না কেন? একটিবার ‘সরি’ বলে আমার রাগ ভাঙালে না কেন? আমি কেন তোমার সাথে সব সময় ব্রেকাপ করতে চাই, ঝগড়া করি, রাগারাগি করি, তুমি বোঝো না? 
একটু আমার রাগ ভাঙিয়ে আদর করে দিতে পারো না? 
সব কিছু কি বলে বলেই বোঝাতে হবে? নিজে থেকে কিছু বুঝতে পারো না?

মোহিত ঠিক এই মুহুর্তে কি বলবে বুঝতে পারছে না।
সে শুধু কেঁদে কেঁদে ফোঁপাতে থাকা রাগিরাগি করা মেয়েটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে আর ভাবছে, এই মেয়েটিকে ছাড়া সত্যিই তার দিন চলবে না। 
তার বুকের ভিতরটা কেমনযেন শান্তি ও ভালোলাগাতে পরিপূর্ণ হয়ে গ্যাছে, সে যেন তার মহামূল্যবান কিছু একটা
ফেরত পেয়েছে, তার হঠাৎ করে ছোট হয়ে আসা পৃথিবীটা ধীরে ধীরে বিশাল আকার ধারন করছে...।